Home > বিশেষ সংবাদ > বেরিয়ে আসছে রাঘববোয়ালদের নাম

বেরিয়ে আসছে রাঘববোয়ালদের নাম

বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে ভারতে আটক হওয়া পি কে হালদারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ইডি। তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়েই দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছেন ইডির কর্মকর্তারা। কলকাতা লাগোয়া সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত ইডির দফতরে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের চলছে এ জিজ্ঞাসাবাদ।

মূলত পি কে হালদার কীভাবে বেনামে এই বিশাল সম্পত্তি তৈরি করলেন তার খোঁজ পেতে চাইছে ইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে তিনি কোন কোন দেশে সেই অর্থ পাঠিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের কোথায় কোথায় তার সম্পত্তি আছে, কারখানা আছে সবকিছু খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। যদিও এর মধ্যে একটি সূত্র জানাচ্ছে, একটানা জেরার মুখে এক প্রকার ভেঙে পড়েছেন পি কে হালদার। তবে এখন পর্যন্ত পি কে হালদার তদন্তে সহায়তা করছেন বলেই জানা গেছে।

সূত্রের খবর, ভারতের সম্পদের পাশাপাশি তার সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রাঘববোয়ালদের নামও বেরিয়ে আসছে। এসব রাঘববোয়ালের সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের তথ্যও দিচ্ছেন পি কে হালদার।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তার বাংলাদেশ ও ভারতে থাকা সম্পদ বিক্রি করে সবকিছু পরিশোধ করে দিতে চাওয়ার কথা। এর আগে তার বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা ও যোগাযোগের কথাও জানিয়েছেন পি কে হালদার। সে সময় কী ধরনের বাধায় দেশে ফিরতে পারলেন না সে তথ্যও দিচ্ছেন গোয়েন্দাদের। কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে মূলত ভারতে তার সম্পদ এবং কারও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে কথায় কথায় বাংলাদেশ ও কানাডার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসছে। তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ ও কানাডার সংশ্লিষ্ট নাম ও তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখছে ইডির কর্মকর্তারা।

ইডির অন্য আরেকটি সূত্র থেকে জানানো হয়েছে, পি কে হালদারের সঙ্গেই গ্রেফতার করা হয় তার ভাইসহ মোট ছয়জনকে। এর মধ্যে একজন নারীও আছেন। ইডির পক্ষ থেকে প্রথমে অনলাইনে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়। যেহেতু রবিবার বিশেষ আদালত ছাড়া বাকি সব আদালতে সাপ্তাহিক ছুটি তাই আদালতের কাছে অগ্রিম আবেদন জানানো হয়েছে এবং সেখানেই তিন দিনের রিমান্ডের আবেদনও করা হয়েছে। শনিবারই তাদের সবাইকে কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হলে তদন্তের স্বার্থে পাঁচজনকে ১৭ মে পর্যন্ত ইডি রিমান্ডের নির্দেশ দেয় আদালত। অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত নারীকে ১৭ মে পর্যন্ত জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের সবাইকে ১৭ মে ফের আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।

তদন্তে নেমে ইডির কর্মকর্তারা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পি কে হালদার বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে জানতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরে এসে শিবশঙ্কর হালদার নামে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকতে শুরু করেন। আর ওই নামেই ভারতীয় আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড বানান এবং অশোকনগরসহ কলকাতায় এই বিশাল সম্পত্তি তৈরি করেন। এদিকে পি কে হালদারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও রাজ্যটির ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যোগসাজশের বিষয়টিও সামনে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। গুরুত্বের সঙ্গে কলকাতার বিভিন্ন স্থানীয় ও সর্বভারতীয় পত্রিকা এবং গণমাধ্যমগুলো খবরটি সম্প্রচার করেছে।

ইতোমধ্যে ইডির হাতে প্রশান্ত হালদারসহ ছয়জনের গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গতকাল মুখ খুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী ও হাবরার তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। এ বিষয়ে তিনি জানান, ‘আইন আইনের পথে চলবে। এখানে কাউকে রেয়াত করা হবে না। যে-ই এ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাকে গ্রেফতার করা হবে।’

এদিকে সূত্রে খবর, ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, পাসপোর্ট আইনসহ একাধিক মামলা করা হয়েছে।

ইডি সূত্রে খবর, ২০১৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে খবর।

গত শুক্রবার অশোকনগরসহ পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ৯টি জায়গায় পি কে হালদার, সুকুমার মৃধা, পৃথ্বীশ কুমার হালদার, প্রাণেশ কুমার হালদার ও তাদের সহযোগীদের খোঁজে অভিযান চালায় ইডির কর্মকর্তারা। আর এর পরই সন্ধান মেলে হালদারসহ অন্য সহযোগীদের। খোঁজ পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বাড়ি ও মাছের ঘেরের।

পশ্চিমবঙ্গের ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ইডি বলেছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পি কে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত মুম্বাই এবং রাজধানী দিল্লিতেও অভিযান চালায় ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী এই সংস্থা।

ইডির সূত্র বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া কোম্পানির নামে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নেন হালদার এবং সেই অর্থ তিনি ভারতে পাচার করেন। হালদারের এসব কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো হালদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারে এবং বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগ দায়ের করে। পরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে ইডি।

হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, বাংলাদেশি এই নাগরিকরা প্রতারণার মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসায়িক কোম্পানি চালু করেন। কোম্পানি পরিচালনার পাশাপাশি কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার অন্তত তিনটি বাড়ি রয়েছে অশোকনগরে। এ এলাকায় তিনি মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে-ইডি : এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্মকর্তারা এই ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। তারা বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০১৬ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় পি কে হালদারকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ভারতীয় এই গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, পি কে হালদারকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের পেছনে দুটি বিষয় রয়েছে।

এর মধ্যে একটি হলো- বাংলাদেশের আর্থিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুরোধ, অন্যটি তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

পি কে হালদারের থেকে বাংলাদেশসহ তিন দেশের পাসপোর্ট উদ্ধার : এদিকে ইডির তরফে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে ‘বাংলাদেশ এবং ভারতীয় পাসপোর্ট-এর পাশাপাশি পি কে হালদারের আফ্রিকার দেশ গ্রেনাডার পাসপোর্ট ছিল। তার বিরুদ্ধে রেড কর্নার নোটিসও ছিল।’

গতকাল পশ্চিমবঙ্গের সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্স ইডির আঞ্চলিক কার্যালয়ে গ্রেফতার পি কে হালদারসহ বাকিদের দিনভর ম্যারাথন জেরা করে ইডির কর্মকর্তারা। সূত্রের খবর বাংলাদেশের তরফ থেকে পাঠানো এই আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক নাম পি কে হালদারকে দেখানো হয়। জানতে চাওয়া হয় তাদের সম্পর্কে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের কোথায় কোথায় নামে-বেনামে সম্পত্তি কিনেছে, বাড়ি তৈরি করেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান করেছে তার হদিস খুঁজতেই জেরা করা হয়। এমনকি এদেশে এই শিকড় গাড়তে কাদের কাদের সাহায্য তারা নিয়েছিল তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এদেশের কাগজপত্র তৈরি জমি কেনা বাড়ি তৈরি এবং বেশ কিছু কারখানা হদিস মিলেছে সেগুলো কখন তৈরি করেছিল সে সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞ মহল বলছেন বাংলাদেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধৃত পি কে হালদারসহ বাকিদের প্রাথমিক পর্যায়ে তদন্ত করবে ইডি। প্রয়োজন হলে সিবিআইকে এই তদন্তে যুক্ত করা হবে। সেক্ষেত্রে আদালতকে জানাবে ইডি, এরপর আদালতের নির্দেশে সিবিআই- এই তদন্তে যুক্ত হতে পারে। তারপর শুরু হবে গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া। অত:পর বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।

শিগগিরই ফেরত এনে বিচারের কথা জানালেন অ্যাটর্নি জেনারেল : প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। গতকাল সুপ্রিম কোর্টে তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের জানিয়েছিল অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি সেখানে অবস্থান করছে। সে তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন তাকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে তার বিরুদ্ধে যে মামলা বিচারাধীন সেই মামলায় বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইডি তাকে গ্রেফতার করেছে। এখন এর পরবর্তী প্রক্রিয়া হচ্ছে, বাংলাদেশে এনে তাকে বিচারের সম্মুখীন করা। আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে, সেটার আওতায় আনা। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে যেহেতু ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি করা আছে, সব ধরনের চেষ্টা করা হবে তাকে আনার জন্য। উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাকে এনে বিচারের সম্মুখীন করা। কারণ এ টাকাটা জনগণের টাকা।

তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আনার বিষয়ে আশাবাদী দুদকের আইনজীবী : দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের তথ্য-উপাত্ত আছে, সেগুলো যদি ভারতকে দিই, যেভাবে পি কে হালদারকে গ্রেফতার করেছে তাদের টিম, ঠিক সেভাবে সে গতিতে যদি কাজটি করে, আমি মনে করি তিন থেকে ছয় মাসের বেশি লাগার কথা নয়।